ছুটি

play_circle_filled
pause_circle_filled
ছুটি
volume_down
volume_up
volume_off
ধরনঃ গল্প
অডিও রূপান্তরঃ
গ্রন্থঃ
দৈর্ঘ্যঃ মিনিট

ছুটি বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট্‌ করিয়া একটা নূতন ভাবোদয় হইল ; নদীর ধারে একটা প্রকাগু শালকাঠ মাস্তুলে রূপান্তরিত হইবার প্রতীক্ষায় পড়িয়া ছিল ; স্থির হইল, সেটা সকলে মিলিয়া গড়াইয়া লইয়া যাইবে । যে ব্যক্তির কাঠ আবখ্যক-কালে তাহার যে কতখানি বিস্ময় বিরক্তি এবং অসুবিধা বোধ হইবে, তাহাই উপলব্ধি করিয়া বালকেরা এ প্রস্তাবে সম্পূর্ণ অমুমোদন করিল। * কোমর বাধিয়া সকলেই যখন মনোযোগের সহিত কার্ধে প্রবৃত্ত হইবার উপক্রম করিতেছে এমন সময়ে ফটিকের কনিষ্ঠ মাখনলাল গম্ভীরভাবে সেই গুড়ির উপরে গিয়া বসিল । ছেলেরা তাহার এইরূপ উদার ঔদাসীন্য দেখিয়া কিছু বিমর্ষ হইয়া গেল । একজন আসিয়া ভয়ে ভয়ে তাহাকে একটু-আধটু ঠেলিল, কিন্তু সে তাহাতে কিছুমাত্র বিচলিত হইল না ; এই অকাল-তত্বজ্ঞানী মানব সকলপ্রকার ক্রীড়ার অসারতা সম্বন্ধে নীরবে চিস্ত করিতে লাগিল । ফটিক আসিয়া আস্ফালন করিয়া কহিল, “দেখ, মার খাবি। এইবেল ૭; ” সে তাহাতে আরও একটু নড়িয়াচড়িয়া আসনটি বেশ স্থায়ীরূপে দখল করিয়া লইল । এরূপ স্থলে সাধারণের নিকট রাজসম্মান রক্ষা করিতে হইলে অবাধ্য ভ্রাতার গণ্ডদেশে অনতিবিলম্বে এক চড় কষাইয়া দেওয়া ফাটকের কর্তব্য ছিল — সাহস হইল না । কিন্তু, এমন একটা ভাব ধারণ করিল, যেন ইচ্ছা করিলেই এখনি উহাকে রীতিমতো শাসন করিয়া দিতে পারে, কিন্তু করিল না ; কারণ, পূর্বাপেক্ষা আর-একটা ভালো খেলা মাথায় উদয় হইয়াছে, তাহাতে আর-একটু বেশি মজা আছে। প্রস্তাব করিল, মাখনকে স্বদ্ধ ওই কাঠ গড়াইতে আরম্ভ कद्भाँ यॉक ! )న్స\ు গল্পগুচ্ছ মাখন মনে করিল, ইহাতে তাহার গৌরব আছে ; কিন্তু, অন্যান্য পার্থিব গৌরবের ন্যায় ইহার আনুষঙ্গিক যে বিপদের সম্ভাবনাও আছে, তাহা তাহার কিম্ব আর-কাহারও মনে উদয় হয় নাই । ছেলেরা কোমর বাধিয়া ঠেলিতে আরম্ভ করিল— ‘মারো ঠেলা হেঁইয়ো, সাবাস জোয়ান হেঁইয়ো ? গুড়ি এক পাক ঘুরিতে না-ঘুরিতেই মাখন তাহার গাম্ভীর্য গৌরব এবং তত্ত্বজ্ঞান -সমেত ভূমিসাৎ হইয়া গেল । খেলার আরম্ভেই এইরূপ আশাতীত ফললাভ করিয়া অন্যান্য বালকেরা বিশেষ হৃষ্ট হইয়া উঠিল, কিন্তু ফটিক কিছু শশব্যস্ত হইল। মাখন তৎক্ষণাৎ ভূমিশয্যা ছাড়িয়া ফটিকের উপরে গিয়া পড়িল, একেবারে অন্ধভাবে মারিতে লাগিল। তাহার নাকে মুখে আঁচড় কাটিয়া কাদিতে কঁাদিতে গৃহাভিমুখে গমন করিল। খেলা ভাঙিয়া গেল । ফটিক গোটাকতক কাশ উৎপাটন করিয়া লইয়া একটা অর্ধনিমগ্ন নৌকার গলুইয়ের উপরে চড়িয়া বসিয়া চুপচাপ করিয়া কাশের গোড়া চিবাইতে লাগিল । এমন সময় একটা বিদেশী নৌকা ঘাটে আসিয়া লাগিল। একটি অর্ধবয়সী। ভদ্রলোক কাচা গোফ এবং পাকা চুল লইয়া বাহির হইয়া আসিলেন। বালককে জিজ্ঞাসা করিলেন, “চক্রবর্তীদের বাড়ি কোথায় ।” বালক ডাটা চিবাইতে চিবাইতে কহিল, “ওই হোখা ।” কিন্তু কোন দিকে যে নির্দেশ করিল, কাহারও বুঝিবার সাধ্য রহিল না। ভদ্রলোকটি আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, “কোথা ।” সে বলিল, “জানি নে “ বলিয়া পূর্ববং তৃণমূল হইতে রসগ্রহণে প্রবৃত্ত হইল। বাবুটি তখন অন্য লোকের সাহায্য অবলম্বন করিয়া চক্রবর্তীদের গৃহের সন্ধানে চলিলেন । অবিলম্বে বাঘা বাগদি আসিয়া কহিল, “ফটিকদাদা, মা ডাকছে।” ফটিক কহিল, “যাব না ।” বাঘা তাহাকে বলপূর্বক আড়কোলা করিয়া তুলিয়া লইয়া গেল ; ফটিক নিষ্ফল আক্রোশে হাত পা ছুড়িতে লাগিল । ফটিককে দেখিবামাত্র তাহার মা অগ্নিমূর্তি হইয়া কহিলেন, “আবার ইতু እ፭›ዓ মাখনকে মেরেছিস ।” rổ ফটিক কহিল, “না, মারি নি।” “ফের মিথ্যে কথা বলছিস ।” *কথখনো মারি নি। মাখনকে জিজ্ঞাসা করে ।” মাখনকে প্রশ্ন করাতে মাখন আপনার পূর্ব নালিসের সমর্থন করিয়া বলিল, *ই, মেরেছে ।” তখন আর ফাটকের সহ্য হইল না। দ্রুত গিয়া মাখনকে এক সশবা চড় কষাইয়া দিয়া কহিল, “ফের মিথ্যে কথা ।” মা মাখনের পক্ষ লইয়া ফটিককে সবেগে নাড়া দিয়া তাহার পৃষ্ঠে দুটাতিনটা প্রবল চপেটাঘাত করিলেন। ফটিক মাকে ঠেলিয়া দিল । মা চীৎকার করিয়া কহিলেন, “অ্যা, তুই আমার গায়ে হাত তুলিস !” এমন সময়ে সেই কাচাপাক বাবুটি ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন, “কী হচ্ছে তোমাদের।” ফটিকের মা বিস্ময়ে আনন্দে অভিভূত হইয়া কহিলেন, “ওমা, এ যে দাদ, তুমি কবে এলে।” বলিয়া গড় করিয়া প্রণাম করিলেন। বহু দিন হইল দাদা পশ্চিমে কাজ করিতে গিয়াছিলেন। ইতিমধ্যে ফটিকের মার দুই সস্তান হইয়াছে, তাহারা অনেকটা বাড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার স্বামীর মৃত্যু হইয়াছে, কিন্তু একবারও দাদার সাক্ষাৎ পায় নাই। আজ বহুকাল পরে দেশে ফিরিয়া আসিয়া বিশ্বস্তুরবাবু তাহার ভগিনীকে দেখিতে আসিয়াছেন । কিছুদিন খুব সমারোহে গেল । অবশেষে বিদায় লইবার দুই-একদিন পূর্বে বিশ্বম্ভরবাবু তাহার ভগিনীকে ছেলেদের পড়াশুনা এবং মানসিক উন্নতি সম্বন্ধে প্রশ্ন করিলেন। উত্তরে ফটিকের অবাধ্য উচ্ছ স্থলত, পাঠে অমনোযোগ, এবং মাথনের সুশাস্ত স্বশীলতা ও বিদ্যামুরাগের বিবরণ শুনিলেন । তাহার ভগিনী কহিলেন, “ফটিক আমার হাড় জ্বালাতন করিয়াছে।” শুনিয়া বিশ্বম্ভর প্রস্তাব করিলেন, তিনি ফটিককে কলিকাতায় লইয়া গিয়া নিজের কাছে রাখিয়া শিক্ষা দিবেন। বিধবা এ প্রস্তাবে সহজেই সম্মত হইলেন । ఏty গল্পগুচ্ছ ফটিককে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন রে ফটিক, মামার সঙ্গে কলকাতায় যাবি ?” ফটিক লাফাইয়া উঠিয়া বলিল, “যাব।” যদিও ফটিককে বিদায় করিতে তাহার মায়ের আপত্তি ছিল না, কারণ র্তাহার মনে সর্বদাই আশঙ্কা ছিল— কোন দিন সে মাখনকে জলেই ফেলিয়া দেয় কি মাথাই ফাটায়, কি কী একটা দুর্ঘটনা ঘটায়, তথাপি ফটিকের বিদায়গ্রহণের জন্য এতাদৃশ আগ্রহ দেখিয়া তিনি ঈষৎ ক্ষুন্ন হইলেন । ‘কবে যাবে কথন যাবে’ করিয়া ফটিক তাহার মামাকে অস্থির করিয়া তুলিল ; উৎসাহে তাহার রাত্রে নিদ্রা হয় না। অবশেষে যাত্রাকালে আনন্দের ঔদার্য-বশত তাহার ছিপ ঘুড়ি লাটাই সমস্ত মাখনকে পুত্রপৌত্রাদিক্ৰমে ভোগদখল করিবার পুরা অধিকার দিয়া গেল । কলিকাতায় মামার বাড়ি পৌছিয়া প্রথমত মামীর সঙ্গে আলাপ হইল । মামী এই অনাবশ্বক পরিবারবৃদ্ধিতে কমনে-মনে যে বিশেষ সস্তুষ্ট হইয়াছিলেন তাহা বলিতে পারি না। র্তাহার নিজের তিনটি ছেলে লইয়া তিনি নিজের নিয়মে ঘরকন্ন পাতিয়া বসিয়া আছেন, ইহার মধ্যে সহসা একটি তেরো বৎসরের অপরিচিত অশিক্ষিত পাড়াগেয়ে ছেলে ছাড়িয়া দিলে কিরূপ একটা বিপ্লবের সম্ভাবনা উপস্থিত হয়। বিশ্বস্তরের এত বয়স হইল, তবু কিছুমাত্র যদি জ্ঞানকাণ্ড আছে । বিশেষত, তেরো-চৌদ্দ বৎসরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই । শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না । স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে । তাহার মুখে আধো-আধো কথা ও ন্যাকামি, পাকা কথাও জ্যাঠামি এবং কথামাত্রই প্ৰগলভতা । হঠাৎ কাপড়চোপড়ের পরিমাণ রক্ষা না করিয়া বেমানানরূপে বাড়িয়া উঠে ; লোকে সেটা তাহার একটা কুত্ৰ স্পর্ধাস্বরূপ জ্ঞান করে। তাহার শৈশবের লালিত্য এবং কণ্ঠস্বরের মিষ্টতা সহসা চলিয়া যায় ; লোকে সেজন্য তাহাকে মনে মৰ্মে অপরাধ না দিয়া থাকিতে পারে না। শৈশব এবং যৌবনের অনেক দোষ মাপ করা Sసిసి যায়, কিন্তু এই সময়ের কোনো স্বাভাবিক অনিবাৰ্য ক্রটিও যেন অসহ বোধ ट्य } } সেও সর্বদা মনে-মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না ; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয় থাকে। অথচ, এই বয়সেই স্নেহের জন্য কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত কাতরতা মনে জন্মায়। এই সময়ে যদি সে কোনো সহৃদয় ব্যক্তির নিকট হইতে স্নেহ কিম্বা সখ্য লাভ করিতে পারে তবে তাহার নিকট আত্মবিক্রীত इहे। থাকে। কিন্তু তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ সাহস করে না ; কারণ সেট সাধারণে প্রশ্রয় বলিয়া মনে করে । স্বতরাং তাহার চেহারা এবং ভাবধান অনেকটা প্রভুহীন পথের কুকুরের মতো হইয়া যায় । 〔い。立す,frー অতএব, এমন অবস্থায় মাতৃভবন ছাড়া আর-কোনো অপরিচিত স্থান বালকের পক্ষে নরক । চারি দিকের স্নেহশূন্ত বিরাগ তাহাকে পদে পদে কাটার মতো বিধে। এই বয়সে সাধারণত নারীজাতিকে কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বৰ্গলোকের দুর্লভ জীব বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয়, অতএব তাহাদের নিকট হইতে উপেক্ষা অত্যস্ত দুঃসহ বোধস্ট্রয়। মামীর স্নেহহীন চক্ষে সে যে একটা দুর্গ্রহের মতো প্রতিভাত হইতেছে, এইটে ফটিকের সব চেয়ে বাজিত। মামী যদি দৈবাৎ তাহাকে কোনো-একটা কাজ করিতে বলিতেন তাহা হইলে সে মনের আনন্দে যতটা আবশ্বক তার চেয়ে বেশি কাজ করিয়া ফেলিত— অবশেষে মামী যখন তাহার উৎসাহ দমন করিয়া বলিতেন, “ঢের হয়েছে, ঢের হয়েছে । ওতে আর তোমায় হাত দিতে হবে না। এখন তুমি নিজের কাজে মন দাও গে। একটু পড়ে গে যাও”— তখন তাহার মানসিক উন্নতির প্রতি মামীর এতটা যত্নবাহুল্য তাহার অত্যস্ত নিষ্ঠুর অবিচার বলিয়া মনে হইত। , , ঘরের মধ্যে এইরূপ অনাদর, ইহার পর আবার হাফ ছাড়িবার জায়গা ছিল না। দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়িয়া কেবলই তাহার সেই গ্রামের কথা মনে পড়িত । প্রকাও একটা ধাউস ঘুড়ি লইয়া বে। বৌ শব্দে উড়াইয়া বেড়াইবার সেই মাঠ, তাইরে নাইরে নাইরে না করিয়া ਢੋਲਾਂ স্বরচিত রাগিণী আলাপ & o o গল্পগুচ্ছ করিয়া অকৰ্মণ্যভাবে ঘুরিয়া বেড়াইবার সেই নদীতীর, দিনের মধ্যে যখন-তখন বীপ দিয়া পড়িয়া সাতার সেই সংকীর্ণ স্রোতস্বিনী, সেই-সব দল-বল উপদ্রব স্বাধীনতা, এবং সর্বোপরি সেই অত্যাচারিণী অবিচারিণী মা অহৰ্নিশি তাহার নিরুপায় চিত্তকে আকর্ষণ করিত , জন্তুর মতো একপ্রকার অস্ত্ৰ ভালোবাস- কেবল একটা কাছে যাইবার অন্ধ ইচ্ছা, কেবল একটা না দেখিয়া অব্যক্ত ব্যাকুলত, গোধূলিসময়ের মাতৃহীন বংসের মতো কেবল একটা আন্তরিক মা মা ক্ৰন্দন– সেই লজ্জিত শঙ্কিত শীর্ণ দীর্ঘ অসুন্দর বালকের অস্তরে কেবলই আলোড়িত হইত। স্কুলে এতবড়ো নির্বোধ এবং অমনোযোগী বালক আর ছিল না। একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলে সে ই করিয়া চাহিয়া থাকিত । মাস্টার যখন মার আরম্ভ করিত তখন ভারক্লাস্ত গর্দভের মতো নীরবে সহ করিত । ছেলেদের যখন খেলিবার ছুটি হইত তখন জানালার কাছে দাড়াইয়া দূরের বাড়িগুলার ছাদ নিরীক্ষণ করিত ; যখন সেই দ্বিপ্রহর-রৌদ্রে কোনো-একটা ছাদে দুটিএকটি ছেলেমেয়ে কিছু-একটা খেলার ছলে ক্ষণেকের জন্য দেখা দিয়া বাইত তখন তাহার চিত্ত অধীর হইয়া উঠিত। এক দিন অনেক প্রতিজ্ঞা করিয়া অনেক সাহসে মামাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, “মামা, মার কাছে কবে যাব।” মামা বলিয়াছিলেন, “স্কুলের ছুটি হোক ৷” কাতিক মাসে পূজার ছুটি, সে এখনো ঢের দেরি। এক দিন ফটিক তাহার স্কুলের বই হারাইয়া ফেলিল। একে তো সহজেই পড়া তৈরি হয় না, তাহার পর বই হারাইয়া একেবারে নাচার হইয়া পড়িল । মাস্টার প্রতি দিন তাহাকে অত্যন্ত মারধোর অপমান করিতে আরম্ভ করিলেন । স্কুলে তাহার এমন অবস্থা হইল যে, তাহার মামাতো ভাইরা তাহার সহিত সম্বন্ধ স্বীকার করিতে লজ্জা বোধ করিত । ইহার কোনো অপমানে তাহারা অন্যান্য বালকের চেয়েও যেন বলপূর্বক বেশি করিয়া আমোদ প্রকাশ করিত । অসহ বোধ হওয়াতে একদিন ফটিক তাহার মামীর কাছে নিতান্ত অপরাধীর মতো গিয়া কহিল, “বই হারিয়ে ফেলেছি।” মামী অধরের দুই প্রান্তে বিরক্তির রেখা অঙ্কিত করিয়া বলিলেন, “বেশ ছুটি ミ・> করেছ ! আমি তোমাকে মাসের মধ্যে পাঁচবার করে বই কিনে দিতে পারি নে ৷” ফটিক আর-কিছু না বলিয়া চলিয়া আসিল— সে যে পরের পয়সা নষ্ট করিতেছে, এই মনে করিয়া তাহার মায়ের উপর অত্যন্ত অভিমান উপস্থিত হইল ; নিজের হীনতা এবং দৈন্ত উহাকে মাটির সহিত মিশাইয়া ফেলিল । স্কুল হইতে ফিরিয়া সেই রাত্রে তাহার মাথাব্যথা করিতে লাগিল এবং গা সি সি করিয়া আসিল। বুঝিতে পারিল, তাহার জর আলিতেছে। বুঝিতে পারিল, ব্যামো বাধাইলে তাহার মামীর প্রতি অত্যন্ত অনর্থক উপদ্রব করা হইবে। মামী এই ব্যামোটাকে যে কিরূপ একটা অকারণ অনাবশ্বক জালাতনের স্বরূপ দেখিবে তাহ সে স্পষ্ট উপলব্ধি করিতে পারিল । রোগের সময় এই অকৰ্মণ্য অদ্ভূত নির্বোধ বালক পৃথিবীতে নিজের মা ছাড়া আরকাহারও কাছে সেবা পাইতে পারে, এরূপ প্রত্যাশা করিতে তাহার লজ্জা বোধ হইতে লাগিল । পরদিন প্রাতঃকালে ফটিককে আর দেখা গেল না। চতুর্দিকে প্রতিবেশীদের ঘরে খোজ করিয়া তাহার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। সেদিন আবার রাত্রি হইতে মুষলধারে শ্রাবণের বৃষ্টি পড়িতেছে। সুতরাং তাহার খোজ করিতে লোকজনকে অনর্থক অনেক ভিজিতে হইল । অবশেষে কোথাও না পাইয়া বিশ্বস্তুরবাবু পুলিসে খবর দিলেন । সমস্ত দিনের পর সন্ধ্যার সময় একটা গাড়ি আসিয়া বিশ্বম্ভরবাবুর বাড়ির সম্মুখে দাড়াইল । তখনো ঝুপ ঝুপ করিয়া অবিশ্রাম বৃষ্টি পড়িতেছে, রাস্তায় এক-হাটু জল দাড়াইয়া গিয়াছে । দুইজন পুলিলের লোক গাড়ি হইতে ফটিককে ধরাধরি করিয়া নামাইয়া বিশ্বস্তুরবাবুর নিকট উপস্থিত করিল। তাহার আপাদমস্তক ভিজা, সর্বাঙ্গে কাদা, মুখ চক্ষু লোহিতবর্ণ, থর্থর করিয়ার্কাপিতেছে। বিশ্বম্ভরবাবু প্রায় কোলে করিয়া তাহাকে অস্তঃপুরে লইয়া গেলেন । মামী তাহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিলেন, “কেন বাপু, পরের ছেলেকে নিয়ে কেন এ কর্মভোগ। দাও ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও।” ২০২ গল্পগুচ্ছ বাস্তবিক, সমস্ত দিন দুশ্চিন্তায় তাহার ভালোরূপ আহারাদি হয় নাই এবং নিজের ছেলেদের সহিতও নাহক অনেক শ্বিট্‌মিটু করিয়াছেন। ফটিক কাদিয়া উঠিয়া কহিল, “আমি মার কাছে যাচ্ছিলুম, আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।” বালকের জর অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল । সমস্ত রাত্রি প্রলাপ বকিতে লাগিল । বিশ্বস্তুরবাবু চিকিৎসক লইয়া আসিলেন । ফটিক তাহার রক্তবর্ণ চক্ষু একবার উন্মীলিত করিয়া কডিকাঠের দিকে হতবুদ্ধিভাবে তাকাইয়া কহিল, “মামা, আমার ছুটি হয়েছে কি।” বিশ্বম্ভরবাবু রুমালে চোখ মুছিয়া সস্নেহে ফটিকের শীর্ণ তপ্ত হাতখানি হাতের উপর তুলিয়া লইয়া তাহার কাছে আসিয়া বসিলেন। ফটিক আবার বিড়, বিড়, করিয়া বকিতে লাগিল ; বলিল, “মা, আমাকে মারিস নে, মা ! সত্যি বলছি, আমি কোনো দোষ করি নি।” পরদিন দিনের বেলা কিছুক্ষণের জন্য সচেতন হইয়া ফটিক কাহার প্রত্যাশায় ফ্যালফ্যাল করিয়া ঘরের চারি দিকে চাহিল। নিরাশ হইয়া আবার নীরবে দেয়ালের দিকে মুখ করিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল । বিশ্বস্তুরবাবু তাহার মনের ভাব বুঝিয়া তাহার কানের কাছে মুখ নত করিয়া মৃদুস্বরে কহিলেন, “ফটিক, তোর মাকে আনতে পাঠিয়েছি।” তাহার পরদিনও কাটিয়া গেল। ডাক্তার চিন্তিত বিমর্ষ মুখে জানাইলেন, অবস্থা বড়োই খারাপ । বিশ্বম্ভরবাবু স্তিমিতপ্রদীপে রোগশয্যায় বসিয়া প্রতি মুহূর্তেই ফটকের মাতার জন্য প্রতীক্ষা করিতে লাগিলেন । ফটিক খালাসিদের মতো স্থর করিয়া করিয়া বলিতে লাগিল, “এক বা ও মেলে না । দো বাও মেলে—এ—এ না ।” কলিকাতায় আসিবার সময় কতকট রাস্ত স্টীমারে আসিতে হইয়াছিল, থালাসিবা কাছি ফেলিয়া স্বর করিয়া জল মাপিতৃ ; কটক প্রলীপে তাহাদেরই অনুকরণে করুণশ্বরে জল মাপিতেছে এবং যে অকুলসমূত্রে যাত্রা করিতেছে, বালক রশি ফেলিয়া কোথাও তাহার তল পাইতেছে না। * এমন সময়ে ফটকের মাতা ঝড়ের মতো ঘরে প্রবেশ করিয়াই উচ্চকলবে ছুটি ” aరి শোক করিতে লাগিলেন। বিশ্বম্ভর বহুকষ্টে তাহার শোকোচ্ছ্বাস নিবৃত্ত করিলে, তিনি শয্যার উপর আছাড় খাইয়া পড়িয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলেন, “ফাটক। সোনা । মানিক আমার !” ফটিক যেন অতি সহজেই তাহার উত্তর দিয়া কহিল, “স্যা।” মা আবার ডাকিলেন, “ওরে ফটিক, বাপধন রে ।” ফটিক আস্তে আস্তে পাশ ফিরিয়া কাহাকেও লক্ষ্য না করিয়া মৃদ্ধ স্বরে কহিল, “মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।”